
বিশেষ প্রতিবেদকঃ যশোরের নওয়াপাড়া নৌবন্দরে সাম্প্রতিক একাধিক ঘটনা ঘিরে চরম উত্তেজনা ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ নৌ-যান শ্রমিক ফেডারেশনের নেতাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ, রাজনৈতিক অপপ্রচার এবং সন্ত্রাসী হামলার প্রতিবাদে শ্রমিকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে। ফেডারেশনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, একটি বিতর্কিত চক্র পরিকল্পিতভাবে সংগঠনের ভাবমূর্তি নষ্ট করতে এবং শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি-দাওয়া দমিয়ে রাখতে অপপ্রচার ও সহিংসতার পথ বেছে নিয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ নৌ-যান শ্রমিক ফেডারেশনের নওয়াপাড়া শাখা কার্যালয়ে জরুরি প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় নেতারা অভিযোগ করেন, “নওয়াপাড়া লাইটারেজ শ্রমিক ইউনিয়ন” নামে একটি সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে শ্রমিকদের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। তাদের সদস্য সংখ্যা খুবই কম হলেও তারা নিজেদের প্রভাবশালী হিসেবে পরিচয় দিয়ে উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি এক সভায় তারা ফেডারেশনের নেতাদের বিএনপি আখ্যা দিয়ে রাজনৈতিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করে বলেও অভিযোগ ওঠে।
ঘটনার পেছনে একটি পুরনো আর্থিক বিরোধও সামনে এসেছে। ২০১৫ সালের ৩১ জানুয়ারি আবদুর রহমানের মালিকানাধীন নাইটার এমভি সেভেন সীজ-৪ নামের একটি জাহাজ দুর্ঘটনায় পড়ে। এ ঘটনায় মেসার্স এম আর শিপিং কর্পোরেশন ও মেসার্স এম এম শিপিং ট্রান্সপোর্টের মধ্যে ক্ষতিপূরণ নিয়ে বিরোধ দেখা দেয়। বিষয়টি খুলনায় বাংলাদেশ নৌ-যান শ্রমিক ফেডারেশনের বিভাগীয় কার্যালয়ে শালিশের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এক কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা থাকলেও নির্ধারিত তারিখে পুরো অর্থ পরিশোধ করা হয়নি। কয়েকটি চেক দিলেও সেগুলোর টাকা উত্তোলন সম্ভব হয়নি বলে অভিযোগ করা হয়।
এদিকে ২০২৬ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি জানা যায়, সংশ্লিষ্ট জাহাজটি নওয়াপাড়ার গোল্ডেন টু ঘাটে অবস্থান করছে। পাওনা অর্থের বিষয়ে কথা বলতে ফেডারেশনের নেতারা জাহাজের মাস্টারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং মালিকপক্ষকে বকেয়া পরিশোধের আহ্বান জানান। ১৮ ফেব্রুয়ারি বিকেলে বাংলাদেশ লঞ্চ লেবার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোঃ হাসান মুন্সী মাস্টার এবং ফেডারেশনের নওয়াপাড়া শাখার অফিস সহকারী মোঃ নিয়ামুল হক রিকো গোল্ডেন টু ঘাট এলাকায় গেলে সেখানে তাদের সঙ্গে উত্তপ্ত বাকবিতণ্ডা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতিপক্ষের লোকজন অকথ্য ভাষায় গালাগাল ও হুমকি দিতে থাকে। একপর্যায়ে একটি ইট দিয়ে নিয়ামুল হক রিকোর মাথায় আঘাত করা হয়। তিনি মাথায় গুরুতর জখম হয়ে মাটিতে পড়ে গেলে আরও কয়েকজন মিলে তাকে কিল-ঘুষি ও রড দিয়ে মারধর করে আহত করে। আশপাশের লোকজন এগিয়ে এলে হামলাকারীরা রিকোকে হত্যার হুমকি দিয়ে পালিয়ে যায়।
ফেডারেশনের নেতারা দাবি করেন, নওয়াপাড়া লাইটারেজ শ্রমিক ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় নেতা সৈয়দ শাহাদাত হোসেন মাস্টার অতীতে সংগঠন থেকে বহিষ্কৃত হন। তার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, অর্থ আত্মসাত এবং মালিকপক্ষের সঙ্গে আঁতাতের অভিযোগ ছিল। বহিষ্কারের পর তিনি আলাদা সংগঠন গঠন করলেও সাধারণ শ্রমিকদের সমর্থন পাননি বলে অভিযোগ করা হয়।
শুধু এই একটি ঘটনা নয়, এর আগেও ১১ দফা দাবিতে চলমান কর্মসূচির সময় চেঙ্গুটিয়া এলাকায় ফেডারেশনের নেতা-কর্মীদের ওপর লোহার পাইপ, হাতুড়ি ও লাঠিসোটা দিয়ে হামলা চালানো হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠে। পরে উল্টো ফেডারেশনের নেতাদের বিরুদ্ধেই থানায় অভিযোগ দায়ের করা হয়, যা শ্রমিকদের কাছে পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র বলে মনে হয়েছে।
নেতাদের ভাষ্য অনুযায়ী, নওয়াপাড়া নৌবন্দরে একটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে সাংবাদিক ও রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে চাঁদাবাজি, জাহাজ থেকে মাসোহারা আদায়, মোবাইল ফোন ছিনতাই এবং শ্রমিকদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মতো অপরাধে জড়িত। ইকবাল হোসেন, সাইফুল, হৃদয় ও রানা নামের কয়েকজনের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ থাকলেও দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়।
পরিস্থিতি আরও গুরুতর আকার নেয় যখন ফেরিঘাট এলাকায় নিয়ামুল হক রিকোর ওপর লাঠি ও লোহার রড দিয়ে আবারও হামলার অভিযোগ ওঠে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে এবং তার অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানানো হয়। ফেডারেশনের নেতারা এই ঘটনাকে পরিকল্পিত হত্যাচেষ্টা হিসেবে আখ্যা দেন।
নওয়াপাড়া শাখার সভাপতি নূরুল হুদা মাস্টারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় নেতারা জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান। তারা বলেন, শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের আন্দোলন দমাতে সন্ত্রাস ও অপপ্রচার চালানো হলে তার কঠোর জবাব দেওয়া হবে।
এই ঘটনার প্রতিবাদে ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ বৃহস্পতিবার সকাল ১১টায় নওয়াপাড়া নৌযান শ্রমিক ফেডারেশন কার্যালয়ের সামনে বড় ধরনের প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন মোঃ হাসান মুন্সী, সভাপতি বাংলাদেশ লঞ্চ লেবার অ্যাসোসিয়েশন। প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাহারুল ইসলাম বাহার, বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক ফেডারেশন খুলনা। বিশেষ বক্তা ছিলেন শ্রমিক নেতা আশুতোষ বিশ্বাস, সভাপতি বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন সংঘ যশোর জেলা ও উপদেষ্টা বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক ফেডারেশন খুলনা। এছাড়া বক্তব্য দেন মোঃ জামাল মাস্টার, সহ-সভাপতি বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক ফেডারেশন খুলনা এবং মোঃ জসিম মাস্টার, সাংগঠনিক সম্পাদক বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক ফেডারেশন খুলনা। সভা পরিচালনা করেন নাজমুল হোসাইন, উপদেষ্টা বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক ফেডারেশন খুলনা ও অফিস কর্মকর্তা নওয়াপাড়া এবং সাধারণ সম্পাদক বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন সংঘ অভয়নগর থানা।
নেতারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, হামলাকারীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা না হলে শ্রমিকরা আরও কঠোর কর্মসূচি দিতে বাধ্য হবে।
