
স্পেনের ছোট গ্রামগুলো সাধারণত নিরিবিলিই থাকে। কিন্তু গতকাল বুধবার সেখানকার রাস্তায় মানুষের ঢল নামে। আকাশ পর্যবেক্ষণে আগ্রহীরা দূরদূরান্ত থেকে ছুটে এসেছেন। কারও হাতে বিশেষ চশমা, কারও হাতে দূরবিন, ক্যামেরা। চাঁদ সূর্যকে পুরোপুরি ঢেকে দেবে, আর দিনের আলোয় হঠাৎ নেমে আসবে অদ্ভুত এক অন্ধকার—এ মুহূর্তের জন্য সবার অপেক্ষা।
গতকাল স্পেনের উত্তরাঞ্চলের কাস্তিয়া ও লেয়ন অঞ্চলের বুর্গোস শহরে স্থানীয় সময় বিকেল ৫টা ৩৪ মিনিটে পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ শুরু হয়। স্থায়িত্ব ছিল দুই মিনিটের কম। রাশিয়া ও গ্রিনল্যান্ডের কিছু এলাকায় তা ছিল প্রায় আড়াই মিনিট। তবে আংশিক গ্রহণটি প্রায় ১ ঘণ্টা ৪৫ মিনিট স্থায়ী হয়।
যুক্তরাষ্ট্র থেকে পরিবারের সঙ্গে ছুটি কাটাতে স্পেনে এসেছেন ৫১ বছর বয়সী বিজ্ঞান শিক্ষক আনা কটস। বিরল এই সূর্যগ্রহণ দেখার সুযোগকে ‘দারুণ’ উল্লেখ করে তিনি জানান, অভিজ্ঞতাটি পরে তাঁর শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে চান।
এবারের পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণটি ইউরোপের মূল ভূখণ্ডের জন্য বিশেষ ঘটনা। ১৯৯৯ সালের পর এবারই প্রথম সেখানে পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখা গেল। আর স্পেনের মূল ভূখণ্ডে এক শতাব্দীর বেশি সময় পর দেখা গেল এমন গ্রহণ। ফলে গ্রহণের পথের মধ্যে থাকা স্পেনের বিভিন্ন এলাকায় কয়েক দিন ধরে সাজ সাজ রব পড়ে যায়।
ফ্রান্সে বসবাসকারী ৫০ বছর বয়সী পেরুর নাগরিক ইয়েনি গুয়েভারা থাকার জায়গা ঠিক না করেই স্পেনে চলে এসেছিলেন। গতকাল সকালে বুর্গোস শহরে পৌঁছান তিনি। তিনি বলেন, ‘জীবনে এবারই সূর্যগ্রহণ দেখার সুযোগ পাচ্ছি।’
ব্রিটিশ সৌরপদার্থবিদ লুসি গ্রিন নিজেকে ‘গ্রহণ শিকারি’ বলে পরিচয় দেন। এবার তিনি স্পেনের মায়োর্কা দ্বীপের কাছে নৌকা থেকে গ্রহণ দেখেছেন। তাঁর ভাষায়, সূর্যগ্রহণ দেখার অভিজ্ঞতা এতটাই আবেগময় যে অনেকে এতে ‘আসক্ত’ হয়ে পড়েন।
গ্রহণ দেখতে মানুষের ভিড়ের কারণে স্পেনের গ্রামাঞ্চলের ছোট রাস্তাতেও যানবাহনের চাপ বেড়েছে। কর্মকর্তারা গ্রহণ দেখতে অতিরিক্ত ১৫ লাখ গাড়ি রাস্তায় নামতে বলে পূর্বাভাস দিয়েছিলেন। স্পেনের কোথাও কোথাও সূর্যগ্রহণ দেখার বিশেষ চশমার সংকট দেখা দিয়েছে। দেশটির অর্থ মন্ত্রণালয় এ গ্রহণকে কেন্দ্র করে অতিরিক্ত ৪ লাখ ৪৬ হাজার পর্যটক আসতে পারেন বলে জানিয়েছিল।
সূর্য ও পৃথিবীর মাঝখানে চাঁদ এসে সূর্যের আলো পুরোপুরি আটকে দিলে পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ হয়। চাঁদের ছায়া যে সরু পথে পৃথিবীর ওপর পড়ে, সেটিই ‘পূর্ণগ্রাসের পথ’। গতকালের গ্রহণের ছায়া রাশিয়ার দুর্গম আর্কটিক অঞ্চল থেকে শুরু হয়ে গ্রিনল্যান্ড ও আইসল্যান্ড পেরিয়ে স্পেনে পৌঁছায়।
শুধু পর্যটক বা গ্রহণপ্রেমীরা নন, বিজ্ঞানীরাও এ ঘটনার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেছেন। পূর্ণগ্রাসের সময় সূর্যের উজ্জ্বল পৃষ্ঠ চাঁদের আড়ালে চলে যাওয়ায় এর বাইরের বায়ুমণ্ডল বা করোনা তুলনামূলকভাবে স্পষ্ট দেখা যায়। এ সময় বিজ্ঞানীরা সৌরবায়ু, সূর্যের চৌম্বকক্ষেত্র ও বাইরের বায়ুমণ্ডল নিয়ে গবেষণার সুযোগ পান।
২০২৭ সালের আগস্টে স্পেনের দক্ষিণাঞ্চল ও উত্তর আফ্রিকার ওপর দিয়ে আরেকটি পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ যাবে। আর ২০২৮ সালে দক্ষিণ-পশ্চিম ইউরোপের আইবেরীয় উপদ্বীপে দেখা যাবে বলয়গ্রাস সূর্যগ্রহণ। এমন গ্রহণের সময় চাঁদ সূর্য ও পৃথিবীর মাঝখানে এলেও সূর্যকে পুরোপুরি ঢাকতে পারে না। ফলে সূর্যের চারপাশে উজ্জ্বল আলোর বলয় বা আগুনের আংটি দেখা যায়।
সম্পাদকঃ মোঃ শাহীনুজ্জামান
সম্পাদকীয়ঃ ৩৩ তোপখানা রোড, মেহেরবা প্লাজা, লেবেল -১১ উত্তর পূর্ব সাইড জাতীয় প্রেসক্লাব ঢাকা- ১০০০।