বিশেষ প্রতিবেদকঃ বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) জোয়ার সাহারা বাস ডিপোতে দৈনিকভিত্তিক সাময়িক শ্রমিকদের মজুরি নিয়ে গুরুতর অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন ডিপোর ম্যানেজার মো. মফিজ উদ্দিন। অভিযোগ রয়েছে, বিআরটিসি প্রধান কার্যালয়ের জারি করা অফিস আদেশ উপেক্ষা করে ডিপোর ৩৩ জন কারিগর ও সংশ্লিষ্ট দৈনিকভিত্তিক শ্রমিককে নির্ধারিত হারের চেয়ে কম মজুরি দেওয়া হচ্ছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, প্রধান কার্যালয়ের আদেশ অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ৭০০ টাকা নির্ধারিত হলেও প্রায় এক বছর ধরে তাদের ৬০০ টাকা করে দেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ প্রত্যেক শ্রমিকের দৈনিক মজুরি থেকে ১০০ টাকা কম দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
শুধু মজুরি কম দেওয়ার অভিযোগই নয়, ডিপোর একটি গাড়ি মেরামতের ব্যয় নিয়েও উঠেছে বড় ধরনের প্রশ্ন। অভিযোগ অনুযায়ী, গাড়িটি মেরামতের জন্য বিআরটিসি প্রধান কার্যালয় থেকে ৩ লাখ টাকা অনুমোদন দেওয়া হলেও পরবর্তী সময়ে একই গাড়ির মেরামত বাবদ ২৪ লাখ টাকার ভাউচার/প্রস্তাবনা প্রধান কার্যালয়ে পাঠিয়ে অনুমোদন নেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় প্রকৃত ব্যয়, ভাউচার ও অনুমোদনের নথি যাচাইয়ের দাবি উঠেছে।
অফিস আদেশেই ৭০০ টাকা, ডিপোতে দেওয়া হচ্ছে ৬০০?
বিআরটিসির হিসাব বিভাগ (পে-রোল) থেকে জারি করা অফিস আদেশে দৈনিকভিত্তিক সাময়িক শ্রমিকদের মজুরি পুনর্নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে।
প্রাপ্ত নথিতে পত্র নং-৩৫.০৪.০০০০.০১৫.১৩.০০১.১৪/৩১৬ উল্লেখ রয়েছে। আদেশে অর্থ মন্ত্রণালয়ের স্মারক নং-০৭.০০.০০০০.১৭৩.৬৬০৫৯.১৫ (অংশ-৩)-১৩০, তারিখ: ২২ মে ২০২৫ খ্রি.-এর আলোকে এবং বিআরটিসি করপোরেশনের আর্থিক অবস্থা পর্যালোচনা ও পর্ষদ সভার সুপারিশ অনুযায়ী দৈনিকভিত্তিক সাময়িক শ্রমিকদের মজুরি হার পুনর্নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে। নথিতে কারিগর ও চালকসহ বিভিন্ন শ্রেণির শ্রমিকের দৈনিক মজুরি পুনর্নির্ধারণের হার উল্লেখ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কারিগর শ্রেণির ক্ষেত্রে ৭০০ টাকা দৈনিক মজুরি দেওয়ার অভিযোগের সঙ্গে নথিতে থাকা পুনর্নির্ধারিত হারের সামঞ্জস্য যাচাই করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অফিস আদেশে আরও স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, উল্লেখিত দৈনিক মজুরি হারে শ্রমিক নিয়োগ করতে হবে। একই সঙ্গে ব্যয়ের ক্ষেত্রে যাবতীয় বিধি-বিধান যথাযথভাবে অনুসরণ না করে কোনো অর্থ প্রদান করা যাবে না এবং Online Banking ব্যতীত কোনো অর্থ প্রদান করা যাবে না বলেও আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে।
আদেশটি মার্চ ২০২৬ মাস থেকে কার্যকর হওয়ার কথা বলা হয়েছে। নথিতে আদেশদাতা হিসেবে আব্দুল লতিফ মোল্লা, অতিরিক্ত সচিব ও চেয়ারম্যান, বিআরটিসি-এর নাম রয়েছে। তবে সরবরাহ করা কপিতে তারিখের ঘরে ০৫/০৩/২৬২ মুদ্রিত/পাঠযোগ্য অবস্থায় রয়েছে—এটি নথির মূল কপি থেকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
৩৩ শ্রমিকের মজুরি থেকে দৈনিক ১০০ টাকা করে কম ?
ডিপোর নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন কারিগর ও চালকের অভিযোগ, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির সময়ে সামান্য আয়ের ওপর নির্ভর করে তাদের সংসার চালাতে হচ্ছে। দৈনিক মজুরি থেকে ১০০ টাকা কম পাওয়ায় তারা আর্থিক সংকটে পড়ছেন এবং কখনো কখনো ধারদেনা করে সংসারের খরচ চালাতে হচ্ছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, নির্ধারিত হারে মজুরি দেওয়া হলে তাদের জন্য কিছুটা স্বস্তি আসত। হিসাবটি আরও গুরুতর হয়ে ওঠে ৩৩ জন শ্রমিকের ক্ষেত্রে। অভিযোগ সত্য হলে প্রত্যেক শ্রমিকের দৈনিক ১০০ টাকা করে কম দেওয়ার অর্থ দাঁড়ায়— ৩৩ জন × ১০০ টাকা = ৩,৩০০ টাকা প্রতিদিন। মাসে ৩০ দিন হিসাবে এ অর্থ দাঁড়ায় প্রায় ৯৯,০০০ টাকা। আর ১২ মাসে তা দাঁড়ায় প্রায় ১১ লাখ ৮৮ হাজার টাকা। অর্থাৎ অভিযোগ অনুযায়ী, ৩৩ জন শ্রমিকের ক্ষেত্রে এক বছর ধরে প্রতিদিন ১০০ টাকা করে কম দেওয়া হয়ে থাকলে সম্ভাব্য ঘাটতির পরিমাণ প্রায় ১১ লাখ ৮৮ হাজার টাকা। তবে প্রকৃত অর্থের পরিমাণ নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট শ্রমিকদের হাজিরা খাতা, মজুরি বিল, ব্যাংক লেনদেন, পে-রোল এবং বিআরটিসির হিসাব নথি পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
‘এই টাকা আমি কি একা খাই, চেয়ারম্যানকে দিয়ে খাই’ ! অভিযোগকারীর দাবি
বিষয়টি নিয়ে ডিপো ম্যানেজার মো. মফিজ উদ্দিনের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি অভিযোগকারীর ভাষ্য অনুযায়ী এমন মন্তব্য করেন— “আপনার কি এই টাকা আমি কি একা খাই। আমি চেয়ারম্যানকে দিয়ে খাই।”
এ সময় তিনি প্রতিবেদকের সঙ্গে অশালীন ও অকথ্য ভাষায় কথা বলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। পরে ডিপোর ট্রাফিক অফিসার মো. তালেব-এর মাধ্যমে প্রতিবেদকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তালেব বলেন, “স্যারের মাথা ঠিক নাই, কী বলতে কী বলেছে। আপনি এদিকে খেয়াল করবেন না। স্যার আপনার সঙ্গে পরে কথা বলবেন।”
মো. মফিজ উদ্দিনের এই বক্তব্যের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। একইভাবে ‘চেয়ারম্যানকে টাকা দেওয়ার’ দাবিটিও স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট চেয়ারম্যান বা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বক্তব্য প্রতিবেদনে সংযুক্ত করা গেলে অভিযোগটির পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যাবে।
৩ লাখের অনুমোদন, ২৪ লাখের ভাউচার—কোথায় গেল অতিরিক্ত ২১ লাখ ?
জোয়ার সাহারা ডিপোর আরেকটি গাড়ি মেরামত নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, গাড়িটি মেরামতের জন্য বিআরটিসির প্রধান কার্যালয় থেকে ৩ লাখ টাকা অনুমোদন করা হয়েছিল। কিন্তু একই গাড়ির মেরামতের জন্য পরবর্তীতে ২৪ লাখ টাকার ভাউচার/প্রস্তাবনা প্রধান কার্যালয়ে পাঠিয়ে অনুমোদন নেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। যদি অভিযোগের নথিপত্র সত্য প্রমাণিত হয়, তাহলে অনুমোদিত ৩ লাখ টাকা ও পরবর্তী ২৪ লাখ টাকার দাবির মধ্যে পার্থক্য দাঁড়ায় ২১ লাখ টাকা।
এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—কেন একই গাড়ির মেরামত ব্যয় ৩ লাখ টাকা থেকে ২৪ লাখ টাকায় উন্নীত হলো? অতিরিক্ত ২১ লাখ টাকার ব্যয়ের যৌক্তিকতা কী? কোন কাজের জন্য কত টাকা ব্যয় হয়েছে? মেরামতের আগে ও পরের এস্টিমেট, ওয়ার্ক অর্ডার, বিল-ভাউচার, বিল অনুমোদন, গাড়ির ওয়ার্কশপ রেকর্ড এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অনুমোদন—এসব নথি যাচাই করলেই প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।
অফিস আদেশের শর্তও কি মানা হচ্ছে ? বিআরটিসির ওই অফিস আদেশে দৈনিকভিত্তিক সাময়িক শ্রমিক নিয়োগ ও অর্থ প্রদানের ক্ষেত্রে একাধিক শর্ত দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে---দৈনিক মজুরি ভিত্তিক চালকের হেভি লাইসেন্স থাকতে হবে, চালককে সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হতে হবে, বয়স ন্যূনতম ২০ বছর হতে হবে এবং ন্যূনতম ২ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। কোনো মামলায় অপরাধী বা এজাহারভুক্ত হলে দৈনিক মজুরি ভিত্তিক শ্রমিক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া যাবে না;
অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে দৈনিকভিত্তিক সাময়িক শ্রমিক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া যাবে না, শ্রমিকের সংখ্যা যথাযথ কর্তৃপক্ষ কর্তৃক অনুমোদিত হতে হবে, উল্লেখিত দৈনিক মজুরি হারেই শ্রমিক নিয়োগ করতে হবে এবং ব্যয়ের ক্ষেত্রে বিধি-বিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করতে হবে;।
Online Banking ছাড়া কোনো অর্থ প্রদান করা যাবে না। ফলে জোয়ার সাহারা ডিপোর ৩৩ জন কারিগরের ক্ষেত্রে নির্ধারিত মজুরি, হাজিরা, পে-রোল, ব্যাংক লেনদেন ও অনুমোদিত জনবলের তালিকা পাশাপাশি পরীক্ষা করলেই অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা সম্ভব।
অনুসন্ধানের দাবি :
অভিযোগগুলো সত্য হলে তা শুধু কয়েকজন শ্রমিকের মজুরি কম দেওয়ার ঘটনা নয়; বরং সরকারি মালিকানাধীন একটি প্রতিষ্ঠানের বেতন ব্যবস্থাপনা, আর্থিক শৃঙ্খলা, অনুমোদন প্রক্রিয়া এবং অভ্যন্তরীণ তদারকি ব্যবস্থা নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করে। তাই জোয়ার সাহারা ডিপোর গত এক বছরের— হাজিরা খাতা, দৈনিক মজুরি বিল, পে-রোল শিট, শ্রমিকদের ব্যাংক হিসাব/অনলাইন ব্যাংকিং রেকর্ড, অনুমোদিত জনবল তালিকা, গাড়ি মেরামতের এস্টিমেট, ওয়ার্ক অর্ডার, ভাউচার, বিল, সংশ্লিষ্ট গাড়ির মেরামত রেকর্ড এবং প্রধান কার্যালয়ের অনুমোদনপত্র—স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা জরুরি। বিশেষ করে ৩৩ জন শ্রমিকের দৈনিক ১০০ টাকা করে মজুরি কম দেওয়ার অভিযোগ এবং ৩ লাখ টাকার অনুমোদনের বিপরীতে ২৪ লাখ টাকার মেরামত ব্যয়ের প্রস্তাব/ভাউচার—এই দুটি বিষয়েই বিআরটিসির অভ্যন্তরীণ অডিট ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি তদন্ত প্রয়োজন।
অভিযোগের সত্যতা তদন্তে প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি শ্রমিকদের প্রাপ্য অর্থ ফেরত দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় আসতে পারে।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে বিআরটিসি চেয়ারম্যান, সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় কর্মকর্তা এবং জোয়ার সাহারা ডিপো ম্যানেজার মো. মফিজ উদ্দিনের পূর্ণাঙ্গ বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী প্রতিবেদনে যথাযথভাবে প্রকাশ করা হবে।
সম্পাদকঃ মোঃ শাহীনুজ্জামান
সম্পাদকীয়ঃ ৩৩ তোপখানা রোড, মেহেরবা প্লাজা, লেবেল -১১ উত্তর পূর্ব সাইড জাতীয় প্রেসক্লাব ঢাকা- ১০০০।