
নিজস্ব প্রতিবেদকঃ দেশের ওষুধ শিল্পে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় এলবিয়ন গ্রুপ সম্প্রতি বারবার আলোচনায় আসছে নানা অভিযোগের কারণে। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে একদিকে প্রতারণা ও চাঁদাবাজির মামলা চলমান, অন্যদিকে নিম্নমানের ওষুধ উৎপাদন এবং শত কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ নিয়ে তদন্ত করছে বিভিন্ন সংস্থা। সব মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানটি এখন বড় ধরনের বিতর্কের ঘূর্ণাবর্তে।
চট্টগ্রামের ইনোভেটিভ ফার্মার স্বত্বাধিকারী কাজী মোহাম্মদ শহিদুল হাসান ২০২৩ সালের ১৬ জানুয়ারি কোতোয়ালিতে মামলা দায়ের করেন। তিনি অভিযোগ করেন, এলবিয়ন ল্যাবরেটরিজ লিমিটেডের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ রাইসুল উদ্দিন, এমডি মোহাম্মদ মুনতাহার উদ্দিন এবং চিফ অ্যাডভাইজার নিজাম উদ্দিন চুক্তিভঙ্গ ও প্রতারণা করেছেন। ১০ বছরের চুক্তি অনুযায়ী এলবিয়ন ওষুধ উৎপাদন করে লাভ ভাগাভাগি করার কথা ছিল। কিন্তু ২০১৬ সালে তারা চুক্তি ভেঙে ৫-৬ কোটি টাকার ওষুধ ইনোভেটিভ ফার্মার গুদামে জমা রেখে ৯টি খালি চেক জামানত হিসেবে নেয়। পরে আবার সেই ওষুধ ফেরত নিয়ে চেকগুলো ফেরত দিতে টালবাহানা শুরু হয়। এমনকি হুমকি দিয়ে ২ কোটি টাকার চাঁদা পর্যন্ত দাবি করা হয়েছে বলে অভিযোগে বলা হয়। মামলা নম্বর—১৫১/২৩। বিষয়টি তদন্ত করছে চট্টগ্রাম মেট্রোর পিবিআই।
এদিকে ড্রাগ টেস্টিং ল্যাবরেটরির ২০২৩ সালের ২৭ অক্টোবরের এক রিপোর্টে দেখা যায়, এলবিয়ন ল্যাবরেটরিজের উৎপাদিত বেশ কিছু ওষুধের মান স্বাভাবিক মানদণ্ডের নিচে। ‘মিমক্স’ নামের অ্যান্টিবায়োটিক ক্যাপসুলে অ্যামোক্সিসিলিনই পাওয়া যায়নি, বরং ভিতরে ছিল সাদা দানা ধরনের পাউডার। ‘ইনডোমেথাসিন’ ক্যাপসুলেও নির্ধারিত পরিমাণের কম উপাদান পাওয়া গেছে। আরও উদ্বেগজনক তথ্য হলো—মানুষ ও পশুর ওষুধ একই ভবনে তৈরি করা হচ্ছিল, যা স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ানোর আশঙ্কা তৈরি করেছে। এছাড়া বাজারে অন্যান্য কোম্পানির তুলনায় অস্বাভাবিক কম দামে ওষুধ বিক্রি করার অভিযোগও রয়েছে, যা নিম্নমানের উৎপাদনের ইঙ্গিত বহন করে।
দুদকে জমা পড়া অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, এলবিয়ন ল্যাবরেটরিজ ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো কর বছরভিত্তিক গোপনে কোটি কোটি টাকার আমদানি-বিক্রয় করেছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছর থেকে ২০২১-২২ পর্যন্ত গোপন রাখা আমদানি ও বিক্রয়ের হিসাব মোটেই ছোট নয়—শুধু একটি বছরেই গোপন আমদের পরিমাণ ৪৯ কোটি টাকার ওপরে। আরও অভিযোগ রয়েছে মালিকপক্ষের নামে বেনামী জমি, একাধিক দামি গাড়ি, ৭টি প্রতিষ্ঠান ও ৯টি ব্যাংক হিসাব গোপন রাখা নিয়ে।
সংস্থাটি বিদেশে উচ্চমানের ওষুধ রপ্তানির দাবি করলেও তদন্তে জানা যাচ্ছে, এসব প্রচারণার অনেক তথ্যই ভ্রান্ত। দেশে মানহীন ওষুধ উৎপাদনের মাঝে রপ্তানি নিয়ে এমন প্রচারণা প্রতিষ্ঠানটির ভাবমূর্তি প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
এলবিয়ন গ্রুপের অধীনে রয়েছে এলবিয়ন ল্যাবরেটরিজ লিমিটেড, এলবিয়ন অ্যানিমেল হেলথ, ব্লু অ্যাকোয়া ড্রিংকিং ওয়াটার, ফেভারিট লিমিটেড, ক্লিনজি ফরমুলেশন, ফবিটা, এলবিয়ন ট্রেডিং কর্পোরেশন, এলবিয়ন ডিস্ট্রিবিউশন, সেগাফ্রেডো জেনেতি এসপ্রেসো (ইতালি) ও এলবিয়ন স্পেশালাইজড ফার্মা লিমিটেডসহ একাধিক প্রতিষ্ঠান।
সব মিলিয়ে বলা যায়, প্রতারণা মামলা, মানহীন ওষুধ উৎপাদন, বিপুল অঙ্কের রাজস্ব ফাঁকি এবং বিভ্রান্তিকর প্রচারণা—এই চার দিকের অভিযোগ এখন প্রতিষ্ঠানটিকে কঠিন অবস্থায় ফেলেছে। এসব বিষয়ে সত্যতা যাচাই এবং সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য পিবিআই ও দুদকের সক্রিয় তৎপরতা এখন জরুরি হয়ে উঠেছে।
সম্পাদকঃ মোঃ শাহীনুজ্জামান
প্রকাশকঃ এস এম নজরুল ইসলাম বাবু
সম্পাদকীয়ঃ ৩৩ তোপখানা রোড, মেহেরবা প্লাজা, লেবেল -১১ উত্তর পূর্ব সাইড জাতীয় প্রেসক্লাব ঢাকা- ১০০০।